সারাদেশ

মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান: রায়পুরে ৫৬ অভিযানে ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকার কারেন্ট জাল জব্দ

  নিজস্ব প্রতিবেদক ২৬ অক্টোবর ২০২৫ , ৫:১০:২৪ প্রিন্ট সংস্করণ

 

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে শেষ হলো সরকার ঘোষিত ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৫’। টানা ২২ দিনব্যাপী এ অভিযানে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতার ফলে এ বছর অভিযানটি সফল ও ফলপ্রসূভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নদীতে মাছ ধরা, পরিবহন, মজুদ ও বিক্রি বন্ধে প্রশাসন ছিল কঠোর অবস্থানে। অভিযান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসন, উপজেলা মৎস্য অফিস, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, রায়পুর থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাঠে ছিলেন।

মোট ৫৬টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ৮ লাখ ৬৮ হাজার মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল (আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৭৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা) এবং ১ হাজার ২১০ কেজি ইলিশ মাছ জব্দ করা হয়। এ সময় ১১ জন জেলেকে মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জব্দকৃত জালগুলো পরবর্তীতে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয় এবং উদ্ধার করা ইলিশ মাছ স্থানীয় এতিমখানা ও দরিদ্র পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয়।

রায়পুরের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. রাশেদ হাসান বলেন, “মা ইলিশ রক্ষা মানেই দেশের ভবিষ্যৎ মাছের ভাণ্ডার রক্ষা করা। এবারের অভিযান ছিল ব্যতিক্রমধর্মী ও সফল। প্রতিদিন সকাল-রাত নদীতে টহল ও অভিযান পরিচালনা করেছি। পাশাপাশি জেলেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি আমরা জেলেদের প্রতি মানবিক আচরণ বজায় রেখেছি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় এবার জেলেদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ফলে ইলিশের প্রজনন পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক নিরাপদ হয়েছে।”

অভিযানে নেতৃত্ব দেন রায়পুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান কাওসার। তিনি বলেন, “সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আমরা চাই মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইলিশের স্বাদ পায়।”

তিনি আরও বলেন, “জেলেদের প্রতি মানবিক সহানুভূতি রেখেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সরকারের দেওয়া খাদ্য সহায়তা যেন প্রকৃত জেলেদের হাতে পৌঁছায়, সেদিকেও কঠোর নজরদারি ছিল।”

অভিযানকালে সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ডের উপস্থিতি নদীতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি নৌ-পুলিশ ২৪ ঘণ্টা টহল কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

নদীপাড়ের জেলেরা জানিয়েছেন, প্রশাসনের প্রচারণা ও সচেতনতা কর্মসূচির কারণে তারা এখন অনেক বেশি দায়িত্বশীল। জেলে হেলাল উদ্দিন বলেন, “এবার প্রশাসন কঠোর ছিল, কিন্তু আমাদের বুঝিয়ে বলেছে কেন মা ইলিশ ধরতে নেই। আগে ভাবতাম এটা শুধু শাস্তির ব্যাপার, এখন বুঝি এটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।”

তবে কিছু জেলে অভিযোগ করেছেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি খাদ্য সহায়তা বিলম্বে পৌঁছায়। কেউ কেউ বলেছেন, তালিকায় নাম না থাকা বা নাম কাটা যাওয়ার কারণে অনেক প্রকৃত জেলে সেই সহায়তা পাননি, আবার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি অপ্রকৃত জেলেদের নাম তালিকায় যুক্ত করেছেন।

উপজেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রায়পুর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৫০০। নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে অনেক জেলে চান, এ সহায়তা যেন আরও দ্রুত ও পর্যাপ্তভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়।

অভিযান শেষে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এবারের অভিযানের সাফল্য ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও জেলেদের আর্থিক উন্নয়নের পথ তৈরি করবে। প্রজননকালীন নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত থাকলে আগামী মৌসুমে নদীতে আরও বেশি ইলিশ ধরা পড়বে, যা দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

রায়পুর উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযান সফল করতে সহযোগিতা করা সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও স্থানীয় জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।

প্রশাসনের প্রত্যাশা, “এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে এবং নদীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে।”

আরও খবর

Sponsered content