
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে চলছে মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের ঘোষিত ২২ দিনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা। এ বছর উপজেলার প্রশাসন, উপজেলা মৎস্য অফিস, কোস্ট গার্ড, থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত টহলের কারণে নদীতে নামতে পারছেন না স্থানীয় জেলেরা। ফলে মেঘনা নদীজুড়ে নেমে এসেছে এক ধরনের নীরবতা, আর জেলেপল্লিতে বইছে হতাশা ও অনিশ্চয়তার হাওয়া।
প্রতিবছর আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি সময় এলেই মেঘনার বুকে হাজারো জেলে নৌকা নিয়ে নামে। ঢেউয়ের বুকে জাল ছুড়ে তারা তুলে আনে রূপালি ইলিশ। কিন্তু এবারের দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। নদীপাড় ঘুরে দেখা গেছে, শত শত মাছ ধরার নৌকা তীরে বাঁধা অবস্থায় অলস পড়ে আছে। জেলেদের ঘরে ঘরে ঝুলছে শুকানো জাল। কেউ বসে গল্প করছেন, কেউবা সময় কাটাচ্ছেন চায়ের দোকানে।
রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের জেলে জাকির হোসেন বলেন, “প্রতিবছর এই সময়টা আমাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় থাকে। কিন্তু এখন নদীতে নামলে প্রশাসন ধরে নিয়ে যায়, মামলা দেয়। তাই নদীতে নামার সাহস পাচ্ছি না। ঘরে বসে আছি, কিন্তু সংসারে খাবার নেই। অনেকেই এখন ধারকর্জ করে দিন চালাচ্ছে।”
আরেক জেলে রফিক মিয়া বলেন, “আমরা নদীতে নামি না, কিন্তু দেখি হিজলা উপজেলার দিক থেকে কিছু কিছু জেলে আসে। তারা রাতে গোপনে নদীতে নামে, মাছ ধরে আবার এদিকেই নিয়ে আসে। আমরা কিছু না করেও তখন দোষটা আমাদের ঘাড়েই পড়ে। প্রশাসন ভাবে রায়পুরের জেলেরা ধরা দিচ্ছে, অথচ আমরা নিয়ম মেনে ঘরে বসে আছি। এতে শুধু বদনামই নয়, আমাদের ওপর প্রশাসনের নজরদারিও আরও কড়া হয়। এখন কেউ নদীর দিকে গেলেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। আসলে আমরা চাই আইন মানতে, কিন্তু বাইরের কিছু লোকের কারণে সব জেলেদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।”
রায়পুরের নদীপাড়ের মানুষ বলছে, প্রশাসনের এ বছরের তৎপরতা অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। রাতদিন টহল চলছে, নৌকা দেখলেই জিজ্ঞাসাবাদ করছে প্রশাসন। স্থানীয় চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরাও জেলেদের সচেতন করছেন।
রায়পুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রাশেদ হাসান রিয়াজ বলেন, “সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে আছে। উপজেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও মৎস্য অধিদপ্তর যৌথভাবে নিয়মিত টহল পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল জব্দ ও কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য মা ইলিশের প্রজনন রক্ষা করা। এই সময় নদীতে মাছ ধরা, পরিবহন, বিক্রি ও মজুত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই নিয়ম মানলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনব্যাপী এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। এ সময়ে দেশের ৩৮টি জেলা অন্তর্ভুক্ত। এসময় ইলিশ ধরা, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাওসার বলেন, “আমরা মা ইলিশ সংরক্ষণে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি। প্রতিদিন নদীতে অভিযান চালানো হচ্ছে। কেউ আইন ভঙ্গ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা চাই, জেলেরা এই সময়টা ধৈর্য ধরে কাটিয়ে উঠুক, যাতে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশের পরিমাণ বেড়ে যায়।”
জেলেরা বলছেন, প্রশাসনের উদ্যোগ ভালো, তবে বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকায় তারা চরম কষ্টে পড়েছেন। চরবংশী এলাকার জেলে শাহাদাত হোসেন বলেন, “আমরা সরকারের নিয়ম মানছি, কিন্তু ঘরে খাবার নাই। একটা পরিবারে পাঁচ-ছয়জন মানুষ, ছোট বাচ্চা আছে-চাল কিনব কীভাবে? এই সময়টায় সরকার যদি চালের পাশাপাশি কিছু নগদ সহায়তা দিত, তাহলে আমরা একটু স্বস্তিতে থাকতে পারতাম।”
উপজেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রায়পুর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৫০০। এদের প্রত্যেককে এই সময়ে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেকের অভিযোগ, তালিকায় নাম না থাকায় বা নাম কাটা যাওয়ায় অনেক প্রকৃত জেলে সেই সহায়তা পাচ্ছেন না। কেউ কেউ বলেছেন, প্রভাবশালীরা তালিকায় অপ্রকৃত জেলেদের নাম ঢুকিয়ে দেয়।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, “আমরা নিয়মিত যাচাই-বাছাই করছি। প্রকৃত জেলেরা যেন সরকারি সহায়তা পান, সেটি নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। কোনো অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মেঘনার তীরে এখন শুধুই ঢেউয়ের গর্জন। যেখানে প্রতিদিন শত শত নৌকা ছুটে চলত, সেখানে এখন নিস্তব্ধতা। তবুও জেলেরা অপেক্ষায়-নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে আবার নদীতে নামবে তারা, হাতে জাল নিয়ে ধরবে সেই রূপালি স্বপ্ন, যেটিই তাদের একমাত্র জীবিকা ও আশার প্রতীক।